Ask any questions or give us your suggestions here Contact Us Join Now!

রামায়ণের উত্তরকাণ্ড কি বাল্মীকির লেখা? জানুন এর প্রক্ষিপ্ত হওয়ার ৬টি অকাট্য প্রমাণ

রামায়ণের উত্তরকাণ্ড কি বাল্মীকির লেখা, নাকি পরে সংযোজিত? সীতার বনবাস ও শম্বূক বধের কাহিনীর পেছনের আসল সত্য জানুন শাস্ত্রীয় প্রমাণের মাধ্যমে।
রামায়ণের উত্তরকাণ্ড কি প্রক্ষিপ্ত - একটি শাস্ত্রীয় বিশ্লেষণ
চিত্র: বাল্মীকি রামায়ণের উত্তরকাণ্ডের প্রামাণিকতা নিয়ে শাস্ত্রীয় পর্যালোচনা
সূচিপত্র (Table of Contents)

রামায়ণের উত্তরকাণ্ড: একটি সমালোচনামূলক বিশ্লেষণ

কে এমন ভারতীয় আছে যে রামায়ণ মহাকাব্য এবং এর রচয়িতা আদি কবি বাল্মীকির সঙ্গে পরিচিত নয়? রামায়ণ আমাদের ভারতীয়দের প্রাণ। এর শিক্ষাগুলি আজও ঠিক ততটাই ব্যবহারিক, যতটা ছিল প্রাচীনকালে। এতে জীবনের গভীর ও গুরুতর সমস্যাগুলির সমাধানের একটি সুস্পষ্ট রূপ ফুটে উঠেছে। একদিকে শ্রী রাম আদর্শ পুত্র, আদর্শ ভাই, আদর্শ শিষ্য, আদর্শ স্বামী, আদর্শ সেবক এবং আদর্শ রাজা; অন্যদিকে সীতা আদর্শ পত্নী, আদর্শ বধূ, আদর্শ ভাবী এবং আদর্শ নারী। যেখানে একদিকে কৌশল্যার আদর্শ মাতৃরূপে চিত্রণ রয়েছে, সেখানে অন্যদিকে লক্ষ্মণের আদর্শ ভাই হিসেবে বর্ণনা রয়েছে। যেখানে ভরতের মতো তপস্বী আদর্শ ছোট ভাইয়ের বর্ণনা রয়েছে, সেখানে হনুমানের মতো আদর্শ সেবকেরও বর্ণনা রয়েছে। যেখানে সুগ্রীবের মতো আদর্শ সহযোগীর বর্ণনা রয়েছে, সেখানে জটায়ুর মতো আদর্শ ত্যাগীরও বর্ণনা রয়েছে। রামায়ণে কী নেই? এতে জীবনদর্শন আছে, জীবনের সার আছে। সংক্ষেপে বলতে গেলে, রামায়ণ আমাদের জীবনযাপনের জন্য সর্বোচ্চ নৈতিক আদর্শের দৃষ্টান্ত দেয়। রামায়ণ থেকে পূর্বকালে জনমানস প্রেরণা ও পথনির্দেশ পেয়েছে, আজও পাচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও পেতে থাকবে।

বর্তমানে প্রাপ্ত রামায়ণের বিভিন্ন সংস্করণে কিছুটা ভিন্নতা রয়েছে। বর্তমানে প্রাপ্ত রামায়ণে সাতটি কাণ্ড রয়েছে—বালকাণ্ড, অযধ্যাকাণ্ড, অরণ্যকাণ্ড, কিষ্কিন্ধাকাণ্ড, সুন্দরকাণ্ড, যুদ্ধকাণ্ড এবং উত্তরকাণ্ড।

সবচেয়ে বিতর্কিত হিসেবে বিবেচিত হয় উত্তরকাণ্ড, কারণ এই কাণ্ডে শ্রী রামের শেষ জীবন, সীতার নিন্দা ও বনগমন, সীতার শোক, লব-কুশের জন্ম, শম্বূক বধ প্রভৃতি বর্ণিত হয়েছে।

উত্তরকাণ্ডের প্রক্ষিপ্ত (সংযোজিত) হওয়ার কারণ

  1. ১. দুটি ফলশ্রুতি

    ষষ্ঠ কাণ্ডের সমাপ্তিতে কবি বাল্মীকি রাবণবধের সঙ্গে রামায়ণের সমাপ্তি ঘোষণা করে ফলশ্রুতি দিয়েছেন। কিন্তু সপ্তম কাণ্ডের শেষেও আবার ফলশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, যা সন্দেহজনক। কারণ, একটি গ্রন্থে দুটি ফলশ্রুতি থাকা সম্ভব নয়।

  2. ২. শ্রী রামের চরিত্রায়ণ

    প্রথম ছয়টি কাণ্ডে (কিছু প্রক্ষিপ্ত শ্লোক বাদে) শ্রী রামকে বীর মহাপুরুষ হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু কেবল সপ্তম কাণ্ডে তাঁকে বিষ্ণুর অবতার হিসেবে চিত্রিত করা হয়েছে, যা মূল বিষয় থেকে বিচ্যুতি ঘটায় এবং প্রক্ষিপ্ত বলে প্রমাণিত হয়।

  3. ৩. অপ্রাসঙ্গিক উপাখ্যান

    সপ্তম কাণ্ডে এমন অনেক উপাখ্যান রয়েছে, যাদের রামায়ণের মূল কাহিনীর সঙ্গে কোনো সম্পর্ক নেই। যেমন—যযাতি-নহুষের কথা, বৃত্রবধ, উর্বশী-পুরুরবার কথা ইত্যাদি। রাবণ ও অন্যান্য রাক্ষসদের বধ ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, তবুও সপ্তম কাণ্ডে রাবণের ইন্দ্রের সঙ্গে যুদ্ধ এবং রাক্ষসদের উৎপত্তির বর্ণনা রয়েছে। হনুমান ও রামের মিলন ইতিমধ্যে হয়ে গেছে, তবুও সপ্তম কাণ্ডে হনুমানের যৌবনকালের উল্লেখ অপ্রাসঙ্গিক মনে হয়।

  4. ৪. নারীর মর্যাদার অবমাননা

    সীতার অগ্নিপরীক্ষা এবং বন নির্বাসনের ঘটনা সপ্তম কাণ্ডে বর্ণিত হয়েছে। সমগ্র রামায়ণের দিকে তাকালে দেখা যায়, শ্রী রাম তাঁর স্ত্রী সীতার অপহরণকারী দুষ্ট রাবণকে খুঁজে বের করে যথাযথ শাস্তি দিয়েছেন। সেই সময়ের সামাজিক মর্যাদার দিকে লক্ষ করলে দেখা যায়, সীতার অপহরণের পরেও রাবণের মধ্যে এতটা শিষ্টাচার ছিল যে, সীতার অনুমতি ছাড়া তিনি সীতাকে স্পর্শ করার সাহস পাননি। তাহলে এটা কীভাবে সম্ভব যে, মর্যাদাপুরুষোত্তম শ্রী রাম, যিনি সেই সময়ে আর্যশিরোমণি হিসেবে পরিচিত ছিলেন, তিনি একজন অজ্ঞ ব্যক্তির মতো সীতার উপর সন্দেহ করবেন, অগ্নিপরীক্ষা করাবেন, শপথ করাবেন, এবং ধোবীর কথায় সীতাকে বনে যাওয়ার নির্দেশ দেবেন? রামায়ণের প্রথম থেকে ষষ্ঠ কাণ্ড পর্যন্ত নারীজাতির সামাজিক অধিকারের বর্ণনা প্রভাবশালীভাবে পাওয়া যায়। যেমন—কৌশল্যার প্রাসাদে বেদ পড়া ও অগ্নিহোত্র করা, কৈকেয়ীর দশরথের সঙ্গে সারথি হয়ে যুদ্ধে অংশ নেওয়া, সীতার শিক্ষাগ্রহণ ও স্বয়ংবরে নিজের পতি নির্বাচন করা ইত্যাদি। নারীর এই সম্মানজনক স্থানের ঠিক বিপরীতে, সপ্তম কাণ্ডে পুরুষ কর্তৃক নারীর উপর সন্দেহ করা, তার পরীক্ষা নেওয়া, তাকে গৃহ থেকে নির্বাসিত করার বর্ণনা থেকে বোঝা যায় যে, মধ্যযুগে যখন নারীকে তুচ্ছ বস্তু হিসেবে গণ্য করা হতো, তখনই এটি প্রক্ষিপ্ত হয়েছে। এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, রামায়ণের উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত।

  5. ৫. বিদেশি পণ্ডিতের মত

    বিদেশি পণ্ডিত হারমান জ্যাকোবি তাঁর বই দাস রামায়ণ-এ লিখেছেন, “যেমন আমাদের অনেক পুরনো সম্মানিত গির্জায় নতুন প্রজন্ম কিছু নতুন অংশ যোগ করেছে এবং কিছু পুরনো অংশের সংস্কার করেছে, তবুও মূল গির্জার গঠনকে ধ্বংস হতে দেয়নি, ঠিক তেমনই ভাটদের অনেক প্রজন্ম মূল রামায়ণে অনেক কিছু যোগ করেছে, যার প্রতিটি অংশ গবেষণার চোখে লুকানো নেই।” জ্যাকোবি স্পষ্টভাবে রামায়ণে প্রক্ষিপ্ত অংশের কথা স্বীকার করেছেন।

  6. ৬. পারস্পরিক স্ববিরোধিতা

    রামায়ণে একদিকে শ্রী রামের কেবট, নিষাদ রাজ, ভিলনী শবরীর সঙ্গে কোনো ভেদাভেদ ছাড়া সদ্ব্যবহারের বর্ণনা রয়েছে। কিন্তু অন্যদিকে, সপ্তম কাণ্ডে শম্বূকের উপর শূদ্র হওয়ার কারণে অত্যাচারের বর্ণনা রয়েছে। এই দুটি বিষয় পরস্পরের সঙ্গে মেলে না। তাই এ থেকেও প্রমাণিত হয় যে, শম্বূক বধের কাহিনীসহ উত্তরকাণ্ড প্রক্ষিপ্ত বা মিশ্রিত।

এইভাবে আরও উদাহরণ দিয়ে উত্তরকাণ্ডের প্রক্ষিপ্ত হওয়ার বিষয়টি প্রমাণ করা যায়। উত্তরকাণ্ড শ্রী রামচন্দ্রের মহান রামায়ণের তাঁর গুণাবলির বিপরীত হওয়ার কারণে এর অংশ নয়।


Related Posts

About the Author

The true seeker of Sanatan Dharma does not chase the divine in temples alone, but finds God in truth, in duty, and in the silence of the soul.

إرسال تعليق

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.