সূচিপত্র (Table of Contents)
ধর্ম ও মজহবের পার্থক্য: কোনটি মানবকল্যাণের পথ?
ধর্ম ও মজহব—এই দুটি শব্দকে প্রায়শই সমার্থক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, যা একটি গুরুতর ভুল। কার্ল মার্কস ধর্মকে ‘আফিমের’ সঙ্গে তুলনা করেছিলেন, কিন্তু তিনি আসলে যাকে ধর্ম বলেছিলেন, তা ছিল মজহব বা সংগঠিত রিলিজিয়ন। ধর্মের নামে প্রচলিত রক্তপাত, অন্ধবিশ্বাস এবং বুদ্ধিবিরোধী কর্মকাণ্ড আসলে ধর্মের রূপ নয়, বরং মজহবের বিকৃত প্রকাশ। মানুষের উন্নতির জন্য কোনটি অপরিহার্য—ধর্ম নাকি মজহব? এই প্রশ্নের উত্তর পেতে হলে প্রথমে এদের মধ্যেকার মৌলিক পার্থক্য বোঝা অত্যন্ত জরুরি।
‘ধর্ম’ শব্দের প্রকৃত অর্থ ও সংজ্ঞা
‘ধর্ম’ শব্দটি সংস্কৃত ‘ধৃ’ ধাতু থেকে উৎপন্ন, যার অর্থ হলো ধারণ করা। "ধার্যতে ইতি ধর্মঃ"—অর্থাৎ, যা ধারণ করা হয়, তাই ধর্ম। বিভিন্ন শাস্ত্র ও মহাপুরুষদের মতে ধর্মের সংজ্ঞা নিচে তুলে ধরা হলো:
- মনুস্মৃতি: ধৈর্য, ক্ষমা, সংযম, অচৌর্য, পবিত্রতা, ইন্দ্রিয়নিগ্রহ, বুদ্ধি, বিদ্যা, সত্য এবং অক্রোধ—এই দশটি হলো ধর্মের লক্ষণ (মনুস্মৃতি ৬.৯)। মনু আরও বলেছেন, “আচারঃ পরমো ধর্মঃ” অর্থাৎ, সদাচারই পরম ধর্ম।
- মহাভারত: “ধারণাদ ধর্মমিত্যাহুঃ, ধর্মো ধার্যতে প্রজাঃ”—অর্থাৎ, যা ধারণ করা হয় এবং যার দ্বারা প্রজারা ধৃত বা সুরক্ষিত হয়, তাই ধর্ম।
- বৈশেষিক দর্শন: মহামুনি কণাদ বলেছেন, “যতোঽভ্যুদয় নিঃশ্রেয়স সিদ্ধিঃ স ধর্মঃ”—অর্থাৎ, যার মাধ্যমে লৌকিক উন্নতি (অভ্যুদয়) এবং পারমার্থিক মুক্তি (নিঃশ্রেয়স) লাভ হয়, তাই ধর্ম।
- স্বামী দয়ানন্দ সরস্বতী: তাঁর মতে, পক্ষপাতমুক্ত ন্যায়, সত্যের গ্রহণ এবং অসত্যের সম্পূর্ণ পরিত্যাগই হলো ধর্ম।
ধর্ম ও মজহবের মধ্যে ১৪টি মৌলিক পার্থক্য
প্রগতিশীল বলে দাবিদার অনেকেই ধর্ম ও মজহবকে এক করে ফেলেন। কিন্তু এদের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য বিদ্যমান। নিচে ১৪টি পয়েন্টের মাধ্যমে এই পার্থক্য তুলে ধরা হলো:
- ধর্ম ও মজহব সমার্থক নয়। ধর্ম ঈমান বা বিশ্বাসের সমার্থক নয়।
- ধর্ম ক্রিয়াত্মক, মজহব বিশ্বাসাত্মক। ধর্ম কর্ম ও গুণের ধারণের মাধ্যমে প্রকাশ পায়, মজহব বিশ্বাসের উপর নির্ভর করে।
- ধর্ম স্বাভাবিক, মজহব অপ্রাকৃতিক। ধর্ম মানুষের স্বভাব ও প্রকৃতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এবং ঈশ্বরীয় বা সৃষ্টির নিয়মের উপর ভিত্তি করে। কিন্তু মজহব মানুষের তৈরি, তাই অপ্রাকৃতিক। মজহবের বৈচিত্র্য ও পরস্পরবিরোধীতা এর মানুষকৃত প্রমাণ।
- ধর্ম সার্বজনীন, মজহব সীমিত। মনু মহারাজের বর্ণিত ধর্মের লক্ষণগুলি সমগ্র মানবজাতির জন্য এক। কোনো সভ্য মানুষ এর বিরোধিতা করতে পারে না। কিন্তু মজহব অসংখ্য এবং কেবলমাত্র সেই মজহবের অনুসারীরা তা মানে। তাই মজহব সার্বজনীন নয়। মজহবে ধর্মের কিছু অংশ থাকার কারণে তাদের কিছু মর্যাদা রয়েছে।
- ধর্মে সদাচার অপরিহার্য, মজহবে নয়। ধর্মাত্মা হতে সদাচারী হওয়া বাধ্যতামূলক। কিন্তু মজহবী হতে সদাচারী হওয়া আবশ্যক নয়। মজহবের অনুসারী না হয়েও কেউ ধর্মাত্মা (সদাচারী) হতে পারে। কিন্তু সদাচারী হলেও কেউ মজহবী হতে পারে না, যতক্ষণ না সে মজহবের বিশ্বাসে ঈমান আনে। উদাহরণস্বরূপ, কোনো সৎ ঈশ্বর উপাসক বা উচ্চমানের সদাচারী হলেও, যতক্ষণ না সে হযরত ঈসা বা বাইবেল, অথবা হযরত মুহাম্মদ ও কুরআনের উপর ঈমান আনে, ততক্ষণ সে খ্রিস্টান বা মুসলমান হতে পারে না।
- ধর্ম মানুষকে মানুষ করে। ধর্ম অর্থাৎ ধার্মিক গুণ ও কর্মের ধারণ মানুষকে মানুষত্ব প্রদান করে। ধর্ম ও মানুষত্ব সমার্থক। খাওয়া, পান করা, ঘুমানো, সন্তান জন্ম দেওয়া—এগুলো মানুষ ও পশুর মধ্যে একই। ধর্মই মানুষকে বিশেষ করে এবং মানুষত্ব প্রদান করে। ধর্মবিহীন মানুষ পশুতুল্য। কিন্তু মজহব মানুষকে কেবল মজহবী বা অন্ধবিশ্বাসী করে, সদাচারী বা ধর্মাত্মা নয়।
- ধর্ম ঈশ্বরের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করে। ধর্ম মোক্ষের জন্য সদাচারী হওয়াকে অপরিহার্য বলে। কিন্তু মজহব মুক্তির জন্য মজহবী হওয়াকে অপরিহার্য বলে এবং সদাচারের চেয়ে মজহবের মতবাদ পালনকে বেশি গুরুত্ব দেয়। উদাহরণস্বরূপ, মজহব অনুসারে, যারা আল্লাহ ও মুহাম্মদকে শেষ নবী হিসেবে মানে, তারা জান্নাতে যাবে, চাই তারা যতই পাপী হোক। কিন্তু অমুসলিম, যতই সদাচারী হোক, কুরআনের আল্লাহ ও রসূলের উপর বিশ্বাস না আনলে নরকের আগুনে জ্বলবে।
- ধর্মে বাহ্যিক চিহ্নের স্থান নেই। ধর্ম লিঙ্গাত্মক নয়। “ন লিঙ্গং ধর্মকারণম্”—বাহ্যিক চিহ্ন ধর্মের কারণ নয়। কিন্তু মজহবে বাহ্যিক চিহ্ন অপরিহার্য, যেমন মুসলমানের জন্য জালিদার টুপি ও দাড়ি রাখা বাধ্যতামূলক।
- ধর্ম পুরুষার্থী করে, মজহব অলস করে। ধর্ম জ্ঞানপূর্বক সৎ আচরণের মাধ্যমে অভ্যুদয় ও মোক্ষের শিক্ষা দেয়। কিন্তু মজহব কেবল মতবাদ মানলেই মুক্তির শিক্ষা দেয়, যা অলসতার পথ।
- ধর্ম মানুষকে স্বাধীন করে, মজহব পরাধীন। ধর্ম ঈশ্বর ও মানুষের মধ্যে কোনো মধ্যস্থতাকারীর প্রয়োজন মানে না, তাই মানুষকে স্বাধীন ও আত্মনির্ভর করে। কিন্তু মজহব মুক্তির জন্য মজহবের প্রবর্তকের সুপারিশকে অপরিহার্য মানে, তাই মানুষকে পরাধীন করে।
- ধর্ম প্রাণত্যাগ শেখায়, মজহব হিংসা। ধর্ম অন্যের হিতের জন্য প্রাণত্যাগ শেখায়। কিন্তু মজহব নিজের স্বার্থে অন্য মানুষ বা পশুর প্রাণহরণের জন্য হিংসা বা কোরবানির বার্তা দেয়।
- ধর্ম সকল প্রাণীর প্রতি প্রেম শেখায়, মজহব বিদ্বেষ। ধর্ম সকল প্রাণীর প্রতি প্রেম শেখায়। কিন্তু মজহব মাংসাশন ও অন্য মজহবের প্রতি বিদ্বেষ শেখায়।
- ধর্ম ঐক্য স্থাপন করে, মজহব বিভেদ। ধর্ম সার্বজনীন আচার ও চিন্তার মাধ্যমে মানবজাতিকে এক কেন্দ্রে একত্রিত করে ভেদাভেদ ও বিরোধ দূর করে। কিন্তু মজহব ভিন্ন ভিন্ন মতবাদ ও কর্তব্যের কারণে পৃথক গোষ্ঠী তৈরি করে বিভেদ ও বিরোধ বাড়ায়।
- ধর্ম একমাত্র ঈশ্বরের উপাসনা শেখায়, মজহব অন্ধবিশ্বাস। ধর্ম কেবল এক ঈশ্বরের উপাসনা শেখায়। কিন্তু মজহব ঈশ্বর ছাড়া মতপ্রবর্তক, গুরু বা মানুষের পূজা শেখায়, যা অন্ধবিশ্বাস ছড়ায়।
উপসংহার
ধর্ম ও মজহবের এই মৌলিক পার্থক্যগুলো বুঝে নিলে সহজেই স্বীকার করতে হয় যে, শ্রেষ্ঠ ও কল্যাণকর কাজে পুরুষার্থ করাই হলো ধর্ম। এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর সম্পদ নয়, বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য এক শ্বাশত পথ। তাই ব্যক্তিগত ও সামাজিক উন্নতির জন্য ধর্মের পালন অপরিহার্য, মজহবের অন্ধ অনুসরণ নয়।