Ask any questions or give us your suggestions here Contact Us Join Now!

অন্তঃকরণের শুদ্ধি: প্রকৃতি, আত্মা ও ঈশ্বরের পথে আধ্যাত্মিক অগ্রগতির স্তরভেদ

জানুন অন্তঃকরণের শুদ্ধির তিনটি স্তর—প্রকৃতি, আত্মা ও ঈশ্বর। সাংখ্য ও যোগদর্শনের আলোকে আধ্যাত্মিক পথে অগ্রগতির এক গভীর বিশ্লেষণ।
অন্তঃকরণের শুদ্ধি ও আধ্যাত্মিক অগ্রগতির স্তর
চিত্র: প্রকৃতি, আত্মা ও ঈশ্বরের পথে আধ্যাত্মিক যাত্রার প্রতীকী রূপ
সূচিপত্র (Table of Contents)

অন্তঃকরণের শুদ্ধি: প্রকৃতি, আত্মা ও ঈশ্বরের পথে আধ্যাত্মিক অগ্রগতি

অন্তঃকরণের শুদ্ধির অগ্রগতি তিনটি স্তরে বিভক্ত: প্রকৃতি, আত্মা এবং ঈশ্বর।

আত্মা হলো সাধক, শরীর হলো সাধনা এবং ঈশ্বর হলো সাধ্য। প্রকৃতি, আত্মা এবং ঈশ্বরের প্রতি পুরুষার্থ একসঙ্গে সমান্তরালভাবে চলে, তবে আমাদের স্তরের উপর নির্ভর করে প্রাধান্য পরিবর্তিত হয়। যদি আমরা প্রকৃতি জ্ঞানের স্তরে থাকি, তবে প্রকৃতির তত্ত্বজ্ঞান বা সাক্ষাৎকারই প্রধান উদ্দেশ্য হয়, এবং আত্মা ও পরমাত্মার প্রতি পুরুষার্থ তুলনামূলকভাবে কম থাকে। এই জ্ঞান ও অবস্থা ক্রমান্বয়ে অর্জিত হয় এবং একে অপরের সহায়ক হয়। এটি অষ্টাঙ্গ যোগের মাধ্যমে বোঝা যায়। যম-নিয়ম পালনের অগ্রগতি ধ্যান ও সমাধির জন্য সহায়ক, এবং ধ্যান ও সমাধির অগ্রগতি যম-নিয়মের পরিপক্কতায় সহায়তা করে।

প্রকৃতির স্তর: শরীর ও কর্ম

প্রকৃতি: শরীরের স্তরে জ্ঞানের মাধ্যমে কাজ করা। উদাহরণস্বরূপ, বর্ণাশ্রম ধর্ম পালন, সমাজ ধর্মের জন্য কাজ, দেশ ধর্ম, মা-বাবার সেবা ইত্যাদি।

সাংখ্য দর্শনের সূত্র (অধ্যায় ১, সূত্র ৬১): “সত্ত্বরজস্তমসাং সম্যাবস্থা প্রকৃতিঃ।” অর্থাৎ, সত্ত্ব, রজঃ এবং তমঃ—এই তিনটি গুণের সমন্বয়ে গঠিত সংঘাতই প্রকৃতি।

আত্মার স্তর: অনাসক্তি ও সমদর্শন

আত্মার স্তরে জ্ঞানের মাধ্যমে কাজ করা: প্রধানত সম্প্রজ্ঞাত সমাধি। কর্তব্যের মাধ্যমে কাজ করা, ঋণমুক্তির ভাবনা নিয়ে কাজ করা, ফলের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া বা অনাসক্তির সঙ্গে কাজ করা। উপাসক এমন জ্ঞান লাভ করেন যে তিনি সমস্ত প্রাণীকে আত্মার মতো দেখেন।

ন্যায় দর্শন (১/১০): “ইচ্ছাদ্বেষপ্রয়ত্নসুখদুঃখ জ্ঞানানি আত্মনো লিঙ্গম্ ইতি।” অর্থাৎ, যেখানে ইচ্ছা-দ্বেষ, প্রয়ত্ন, সুখ-দুঃখ এবং জ্ঞান থাকে, সেখানে চেতন বা জীবাত্মার অস্তিত্ব বোঝা উচিত।

ঈশ্বরের স্তর: সমর্পণ ও নিষ্কাম কর্ম

ঈশ্বরের স্তরে অগ্রগতি: প্রধানত অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি। ক্লেশমুক্ত কর্ম, নিষ্কাম কর্ম ইত্যাদি ঈশ্বরীয় গুণাবলি বিকাশের জন্য কাজ করা। বুদ্ধিকে ঈশ্বরের (শাস্ত্রের মাধ্যমে প্রদত্ত) প্রতি সমর্পণ করে কাজ করা এবং মনকে ঈশ্বরের গুণ, কর্ম, স্বভাবে সমাহিত করা। আমরা সর্বদা সর্বোৎকৃষ্টকে আরও ভালো কিছু উৎসর্গ করি, তাই সমর্পণের আগে প্রতিটি কাজে সর্বোৎকৃষ্ট পুরুষার্থ প্রদান করব।

আত্মিক অগ্রগতির বিস্তারিত বিশ্লেষণ

প্রকৃতির তত্ত্বজ্ঞান ও সাক্ষাৎকার

প্রকৃতি পরিবর্তনশীল, নশ্বর এবং ক্ষয়প্রাপ্ত। আত্মবৎ ব্যবহারের তাৎপর্য হলো, অহংকার ত্যাগ করে শারীরিক চেতনা থেকে মুক্ত হওয়া এবং জড় শরীর থেকে আধ্যাত্মিক পরিচয়ের পার্থক্য জানতে পারা। তাই তারা নিজেদের লৌকিক কর্মের কর্তা মনে করেন না এবং সমস্ত ক্রিয়াকে ত্রিগুণের পরিবর্তন হিসেবে বিবেচনা করেন।

মনের মানসিক গুণ অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং বিভিন্ন গুণের মধ্যে দ্রুত ওঠানামা করে। মনের প্রধান গুণ একটি লেন্সের মতো কাজ করে, যা আমাদের চারপাশের বিশ্ব সম্পর্কে আমাদের ধারণা ও দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রভাবিত করে। যদি মন রজোগুণে থাকে, তবে বিশ্বের ঘটনাগুলোকে অরাজক, বিভ্রান্তিকর এবং অতিরিক্ত প্রত্যাশাপূর্ণ মনে হবে, এবং রজসিকভাবে প্রতিক্রিয়া দেখানোর প্রবৃত্তি থাকবে।

সুখ-দুঃখ, মান-অপমান, লাভ-ক্ষতি ইত্যাদি দ্বন্দ্বগুলোকে সহজভাবে গ্রহণ করা, অনুকূল-প্রতিকূল পরিস্থিতি মেনে নেওয়া, যথাসম্ভব নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তনের চেষ্টা করা, এবং পরিবর্তন না হলে সহজভাবে মেনে নেওয়া।

যোগীদের পথে অগ্রসর হতে হলে আত্ম-নিরীক্ষণ ও দ্রষ্টা হওয়ার জন্য বিবেকের চর্চা করতে হবে এবং গুণের ক্রিয়াকলাপের প্রতি প্রতিক্রিয়া না দেখানো উচিত। আমাদের চিন্তা ও কাজকে তমঃ ও রজঃ থেকে সত্ত্বগুণের সংযম ও উদ্দেশ্যের দিকে সচেতনভাবে পরিবর্তন করার অভ্যন্তরীণ শক্তি ও ইচ্ছাশক্তি থাকা উচিত।

পুরুষ ও প্রকৃতির সংযোগ

পুরুষ একটি পৃথক চৈতন্য সত্তা, এবং প্রকৃতি একটি পৃথক জড় সত্তা। মিথ্যাজ্ঞানের কারণে এই দুই বিপরীত স্বভাবের সংযোগ ঘটে। এই সংযোগের ফলে নিত্য শুদ্ধ, বুদ্ধ ও মুক্ত স্বভাবের আত্মা চিত্তে উত্থিত বৃত্তির সঙ্গে একাত্ম হয়ে সুখ-দুঃখ অনুভব করতে থাকে এবং অহংকারের কারণে নিজেকে কর্তা ও ভোক্তা মনে করে। ক্রোধ, লোভ, কাম ও মোহের ঢেউ নিজের মধ্যেই উত্থিত হচ্ছে বলে দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করে। এই সবই বিশুদ্ধ আত্মা ও বিপরীত প্রকৃতির সংযোগের ফলে ঘটে। এই সংযোগ ভাঙার একমাত্র উপায় হলো—যথার্থ জ্ঞানের প্রাপ্তি এবং অন্তঃকরণের শুদ্ধি।

পরিস্থিতিতে আত্মবৎ ব্যবহার

অভ্যন্তরীণ চিন্তন: জীবন, সংসার, অনুকূল বা প্রতিকূল পরিস্থিতি, মানুষ, চিন্তা, পরিবেশ—সবকিছুকে কোনো প্রতিরোধ ছাড়াই যেমন আছে তেমন গ্রহণ করা। পরিবর্তন প্রকৃতির মৌলিক গুণ (ত্রিগুণ)। এগুলোতে ভালো-মন্দের লেবেল না লাগানো। এগুলো তেমনই আছে এবং নিরন্তর পরিবর্তিত হচ্ছে। এই চিন্তা মনকে সমাধানের জন্য প্রস্তুত করে। দর্শনের অর্থ হলো জিনিসগুলোকে যেমন আছে তেমন দেখা, শুধু ত্রিগুণের পরিবর্তন ঘটছে। এটি না দেখলে অবাস্তব প্রত্যাশা তৈরি হবে, যা পূরণ না হলে দ্বেষ, ক্রোধ, নিরাশা জন্মাবে।

যখন আমরা পরিস্থিতির বাস্তবতা মেনে নিই, তখন আমরা বিচলিত হই না। বাস্তবতা হলো ত্রিগুণের পরিবর্তন ঘটবে। যদি কেউ এতে সহমত না হয়, তবে তা স্বাভাবিক। এটি শুধু গুণের সঙ্গে গুণের মিথস্ক্রিয়া।

অনেকে তর্ক করেন, আমরা অন্যায় কেন মেনে নেব? আমাদের কোনো মানুষের ব্যবহার বা প্রতিকূল পরিস্থিতি মেনে নিতে হবে না, বরং সংসারের পরিবর্তনশীল নিয়ম, যা মূলত প্রকৃতি থেকে উদ্ভূত, তা মেনে নিতে হবে।

মেনে নেওয়ার পর আমরা পরিস্থিতি পরিবর্তনের জন্য পূর্ণ পুরুষার্থ করতে পারি। যদি পরিবর্তন না হয়, তবে তা সহজভাবে মেনে নিতে হবে।

সাংসারিক লক্ষ্যের উদ্দেশ্য: প্রাথমিক লক্ষ্য অর্জন, অর্থাৎ অন্তঃকরণের শুদ্ধি। সাংসারিক মানুষ তখনই খুশি হন যখন তারা যা চান তা পান, এবং না পেলে দুঃখী হন। কিন্তু কর্মযোগী তখন খুশি হন যখন তিনি যা চান তা পান, এবং না পেলেও খুশি হন, কারণ তাঁর লক্ষ্য মনের শান্তি, বস্তুগত সাময়িক সুখ নয়।

আত্মার স্তরে সকলের সঙ্গে কথোপকথন করুন। আত্মা শুদ্ধ, নির্দোষ, পবিত্র এবং মুক্ত। বিপরীত ব্যক্তির খারাপ ব্যবহার মনের অশুদ্ধির কারণে হয়, কিন্তু আত্মার রূপে সকলেই শুদ্ধ।

তাদের ছোট শিশুর মতো ভাবুন, যাদের জ্ঞান কম কিন্তু তারা পবিত্র। তারা পিতার কাঁধে বসে বলে, “আমি পিতার চেয়ে লম্বা।”

ফলের আকাঙ্ক্ষা ছাড়া কর্তব্য হিসেবে কাজ করা। কর্তব্যকর্মের মূল উদ্দেশ্য হলো অন্তঃকরণের শুদ্ধি (ক্লেশমুক্ত ক্রিয়া)। এমন কর্তব্যকর্ম কখনো করা উচিত নয় যা ক্লেশযুক্ত।

ঋষিঋণ, সমাজঋণ ইত্যাদি পরিশোধের ভাবনা নিয়ে কাজ করা।

সার্বজনিক উপস্থাপনার স্তরভেদ

১. তামসিক উপস্থাপনা

উপস্থাপনা অসত্য, যম-নিয়ম, সর্বজনীন নিয়ম বা ধর্মের বিরুদ্ধে, অন্যের কল্যাণের জন্য নয়, শুধু নিজের স্বার্থের জন্য। বাহ্যিক ভৌতিক ফলের প্রত্যাশা (কেবল ইন্দ্রিয় সুখ)। ক্লেশের উদ্দীপ্ত/বিচলিত অবস্থা। তামসিক নিম্নমানের ও স্বল্প পরিমাণ সুখ। অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক শুদ্ধির ভ্রম। তমোগুণ প্রধান অন্তঃকরণ। জ্ঞানের অবস্থা: ভুল তথ্য। উদাহরণ: সন্ত্রাসবাদীদের মগজ ধোলাই।

২. রাজসিক/সাত্ত্বিক মিশ্রিত উপস্থাপনা

উপস্থাপনার বিষয় সত্য, অভিজ্ঞতা অপরিপক্ক, উদ্দেশ্য নিজের ভৌতিক কল্যাণ (লোকেষণা, বিত্তেষণা, পুত্রেষণা) এবং অন্যের কল্যাণ। বাহ্যিক ভৌতিক ফল ও অন্তঃকরণের শুদ্ধির প্রারম্ভ। নিম্ন স্তরের সাত্ত্বিক সুখ। ক্লেশের তনু অবস্থা। সত্ত্ব, রজঃ ও তমঃ গুণের সমান ওঠানামা। জ্ঞানের অবস্থা: সাধারণ জ্ঞান। উদাহরণ: ভালো রাজনীতিবিদ ও সমাজসেবী।

৩. সাত্ত্বিক উপস্থাপনা (সম্প্রজ্ঞাত সমাধি)

উপস্থাপনার বিষয় সত্য, অভিজ্ঞতা পরিপক্ক, কর্তব্য বা ঋণ পরিশোধের ভাবনা নিয়ে উপস্থাপনা। কোনো ভৌতিক ফল নয়, শুধু অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি লক্ষ্য। পরিপক্ক সাত্ত্বিক সুখ। ক্লেশের সংস্কার ক্ষীণ অবস্থা। বেশিরভাগ সময় সত্ত্বগুণ প্রধান, কিন্তু পূর্ণ স্থিরতা নেই। কর্মের প্রকার: নিষ্কাম ও শুভ সকাম কর্ম। জ্ঞানের অবস্থা: বিবেক খ্যাতি ও বৈরাগ্য। উদাহরণ: সম্প্রজ্ঞাত সমাধিস্থ যোগীর প্রবচন।

৪. শুদ্ধ সাত্ত্বিক উপস্থাপনা (অসম্প্রজ্ঞাত সমাধি)

উপস্থাপনার বিষয় সত্য, অভিজ্ঞতা পরিপক্ক, ঈশ্বরের গুণাবলি অর্জনের ভাবনা নিয়ে উপস্থাপনা, যেমন সমাজের কল্যাণের জন্য সত্যজ্ঞানের প্রচার, ঈশ্বরের (শাস্ত্রের) প্রতি সমর্পণ। কোনো ভৌতিক ফল নয়, শুধু অভ্যন্তরীণ শুদ্ধি ও ক্লেশমুক্ত চিত্ত। সংস্কারের দগ্ধবীজ অবস্থা। নির্গুণ অবস্থা (সত্ত্বগুণ প্রধান, সংযমিত রজঃ ও তমঃ গুণ)। কর্মের প্রকার: নিষ্কাম কর্ম। জ্ঞানের অবস্থা: পরবৈরাগ্য ও অবিপ্লব বিবেক খ্যাতি। উদাহরণ: মহর্ষির শাস্ত্র বা জীবন্মুক্ত যোগীর প্রবচন।


Related Posts

About the Author

The true seeker of Sanatan Dharma does not chase the divine in temples alone, but finds God in truth, in duty, and in the silence of the soul.

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

Cookie Consent
We serve cookies on this site to analyze traffic, remember your preferences, and optimize your experience.
Oops!
It seems there is something wrong with your internet connection. Please connect to the internet and start browsing again.
AdBlock Detected!
We have detected that you are using adblocking plugin in your browser.
The revenue we earn by the advertisements is used to manage this website, we request you to whitelist our website in your adblocking plugin.
Site is Blocked
Sorry! This site is not available in your country.