সূচিপত্র (Table of Contents)
মোক্ষ প্রাপ্তির সোপান: বৈদিক আশ্রম ব্যবস্থা
মৃত্যু-বন্ধন থেকে মুক্তির প্রার্থনা
মানুষের একমাত্র ইচ্ছা ও আকাঙ্ক্ষা প্রকাশকারী এই বিখ্যাত মন্ত্রটি নিম্নরূপ:
ত্রয়ম্বকং যজামহে সুগন্ধিং পুষ্টিবর্ধনম্।
ঊর্বারুকমিব বন্ধনান্মৃত্যোর্মুক্ষীয় মামৃতাত্।।
(ঋগ্বেদ ৭/৫৭/১২, যজুর্বেদ ৩/৬০)
একজন সত্যিকারের আস্তিক তাঁর অন্তরের ইচ্ছা প্রকাশ করতে গিয়ে বলেন—আসুন! আমরা সেই ত্রয়ম্বক প্রভুর ভজন করি, তাঁর পূজা-অর্চনা করি, যার ফলে আমরাও মৃত্যু-বন্ধন থেকে এমনভাবে মুক্ত হতে পারি, যেমন পাকা তরমুজ তার লতা বা ডাল থেকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিচ্ছিন্ন হয়। তাকে জোর করে ছাড়াতে হয় না, বরং লতা থেকে ছাড়া পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকে সুগন্ধ ও পুষ্টি ছড়িয়ে পড়ে। বলা হয়, যখন মৃত্যুজয়ী, কালজয়ী পুরুষ সংসারের ডাল থেকে মুক্ত হন, তখন তাঁদের অবস্থা এমনই হয়।
সৃষ্টি ও মানবদেহ: মোক্ষের সাধন
এই বিশ্বকে তস্থুষঃ অর্থাৎ জগৎ বলা হয়। জগতের অর্থ গতিশীল, পরিবর্তনশীল। কলকল করে চলা সময় কাল আবার ফিরে আসে না। এই কলকলের মধ্যেই সমগ্র সংসার অবস্থিত। একবার এক জিজ্ঞাসু ঋষিবর দয়ানন্দকে প্রশ্ন করেছিলেন— “পরমাত্মা বসে বসে এই সংসার রচনার কথা কেন ভাবলেন? বিনা কারণে তিনি এই ঝামেলা নিজের মাথায় নিলেন।”
এই প্রশ্ন শুনে ঋষিবর প্রথমে মৃদু হাসলেন, তারপর প্রশ্নকর্তাকে সরল ভাষায় উত্তর দিলেন— “পরমাত্মার একটি গুণ হলো ন্যায়কারী হওয়া। প্রত্যেক জীবকে তার কর্মের ফল দিতে হয়। প্রলয়ের পর যদি সৃষ্টি না হতো, তবে জীব কীভাবে প্রলয়ের পূর্বে কৃত কর্মের ফল পেত? গুণ ও গুণীর সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। এই ক্রম চিরকাল ধরে চলে আসছে, বর্তমানে চলছে এবং ভবিষ্যতেও চলবে। এটি সৃষ্টির নিয়ম অনুযায়ীই ঘটে, তাই এটি স্বাভাবিক। প্রকৃতি তো উপাদান কারণ। মানুষকে মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য পরমাত্মা প্রকৃতির বিকৃতি থেকে পঞ্চভূত ও তন্মাত্রা সহ এই দেহ প্রদান করেছেন। একজন কবি ঠিকই বলেছেন:
ক্ষিতি, জল, পাবক, গগন সমীরা।
পঞ্চতত্ত্ব রচা এই মহা শরীরা।।
পৌরাণিক যুগে কিছু হীনমনা কবি মহা শব্দের পরিবর্তে অধম বলে এই দেহকে নিম্নমানের করে তুলেছেন। অথচ এই দেহ মোক্ষ প্রাপ্তির একটি সুন্দর সাধন। বৈদিক ভাষায় এই দেহকে কাঞ্চন কায়া বলা হয়। ‘শরীরং মাদ্যং খলু ধর্মসাধনম্’ বলে দেহের মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
জীবনের সোপান: আশ্রম ও সংস্কার
ভারতীয় মনীষীরা জন্ম থেকে শতবর্ষীয় জীবনকে চারটি ভাগে বিভক্ত বা সুসংগঠিত করেছেন। এই প্রতিটি জীবনখণ্ডকে সুন্দর নাম দিয়ে এবং একটি সুন্দর প্রত্যয় যুক্ত করে শব্দটিকে মর্যাদাপূর্ণ করেছেন। যথা—ব্রহ্মচর্যাশ্রম, গৃহস্থাশ্রম, বানপ্রস্থাশ্রম এবং সন্ন্যাসাশ্রম। এই চারটি বিভাগে একটি সুন্দর প্রত্যয় বৈদিক দর্শনের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে। জীবনের শুরু থেকে মৃত্যু পর্যন্ত মানুষকে শ্রমই করতে হয়। কিন্তু সংস্কৃতে যাকে শ্রম বলা হয়, বৈদিক সংস্কৃতে তাকে তপ বলা হয়। এটি মনে রাখা প্রয়োজন যে তপ-এর বিপরীত শব্দ পত, যার অর্থ পতন বা অধঃপতন। পতন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য তপ করাই কাম্য। এই তপের মর্যাদা, মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য, জন্মের পূর্বের সংস্কার, মাতা-পিতার সংস্কার ইত্যাদির পরিমার্জনের জন্য ভারতীয় মনীষীরা সংস্কারের ব্যবস্থা করেছেন। এই কারণেই মহর্ষি দয়ানন্দ সংস্কার বিধিতে একটি অতি সুন্দর বাক্য লিখেছেন— ‘বেদানুকূলৈ গর্ভাধানদ্যন্ত্যেষ্টি পর্যন্তৈঃ ষোড়শ সংস্কারঃ সমন্বিতঃ’ অর্থাৎ গর্ভাধান সংস্কার থেকে অন্ত্যেষ্টি সংস্কার পর্যন্ত সম্পন্ন করার পদ্ধতিকে এখানে বেদানুকূল পদ্ধতিতে সমন্বিত ও স্বীকৃত করা হয়েছে। ঋষিবর দয়ানন্দের এই বিশ্বাস উল্লেখযোগ্য যে—শিশুর মন-মস্তিষ্ক কখনো খালি পাতা বা ফাঁকা স্লেট নয়। বরং গর্ভে আগত জীব তার সূক্ষ্ম শরীরের সঙ্গে পূর্বজন্মের সংস্কারও নিয়ে আসে। তাই তাদের পরিমার্জন করা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। যদি সংস্কারগুলি শ্রেষ্ঠ হয়, তবে তারা এখানে আরও শ্রেষ্ঠতম হয়ে উঠবে। আর যদি নিকৃষ্ট বা অতি নিকৃষ্ট হয়, তবে তাদের পরিশোধন ও ত্যাগ করা প্রয়োজন। এই দুঃসাধ্য কাজের জন্য শ্রম বা তপ করা আবশ্যক।
শ্রম ও বেদশ্রমী: জ্ঞানের সাধনা
আমার পূজনীয় গুরুজি পণ্ডিত বীরসেনজি বেদশ্রমীকে একদিন তাঁর শ্রীচরণে মাথা নত করে বিনম্রভাবে প্রশ্ন করেছিলাম—আপনি আপনার উপাধিতে বেদশ্রমী শব্দটিই কেন বেছে নিলেন? এই প্রশ্ন শুনে বেদবিদ্যাবারিধি গুরুজি যে উত্তর দিলেন, তা বিশ্বের সমস্ত বেদভক্তদের চিরস্মরণীয়।
তিনি বললেন—মনু, শ্রম তো সবাই করে। শ্রম ও তপেরও অনেক ভেদ-প্রভেদ রয়েছে। কিন্তু যে জিজ্ঞাসু বেদরূপী সমুদ্র থেকে সুন্দর মণি, কাঞ্চন ও অমৃত সংগ্রহ করে আনেন বা তাতে নিমগ্ন থাকেন, তাঁরাই বেদশ্রমী বলে পরিচিত হন। যখন শ্রম করাই কাম্য, তবে পরমাত্মা প্রদত্ত জ্ঞান অর্জনের জন্য শ্রম করা উচিত এবং জীবনকে সফল করা উচিত। পূজনীয় গুরুজির এই অটল বচন শুনে আমি ভাববিহ্বল হয়ে পড়ি। ধন্য বেদশ্রমীজি!
প্রথম সোপান—ব্রহ্মচর্যাশ্রম
এই উদ্ধৃতির উদ্দেশ্য এই যে, শ্রমই জীবন এবং জীবনের আরেকটি সমার্থক শব্দ হলো শ্রম। তাই মোক্ষের আকাঙ্ক্ষী সেই জীব, যে এই দেহ ধারণ করে তার যাত্রা শুরু করেছে, তার প্রথম পড়াও হলো ব্রহ্মচর্যাশ্রম। ব্রহ্মচর্যের অর্থ শুধু যৌন সম্পর্কের উপর চিন্তাগত বা ইচ্ছাগত নিয়ন্ত্রণ নয়। এটি জীবনশালার প্রথম শ্রেণি। এখানে ব্রহ্ম শব্দের অর্থ পরমাত্মা, বেদবিদ্যা, সত্য, আধ্যাত্মিক লক্ষ্য প্রাপ্তির উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, বয়স অনুযায়ী প্রত্যেক পুরুষকে তাঁর রজ-বীর্য রক্ষা করে শ্রম ও তপের মাধ্যমে সত্য ও ঈশ্বরের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করতে হবে। যোগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ এবং মহর্ষি দয়ানন্দ একজন ঋতুগামী সদগৃহস্থকেও ব্রহ্মচারী বলেছেন। এই ব্রহ্মচর্যব্রত, ঈশ্বর, সত্য ও মোক্ষ প্রাপ্তির লক্ষ্য গৃহস্থাশ্রম, বানপ্রস্থাশ্রম এবং সন্ন্যাসাশ্রমের সমাপ্তি পর্যন্ত অব্যাহত থাকে। তাই মোক্ষ প্রাপ্তির প্রথম সহজ, সুন্দর ও সরল সোপান হলো ব্রহ্মচর্যাশ্রম। এখান থেকেই জীবনযাত্রার শুভ সূচনা হয়।
দ্বিতীয় সোপান - গৃহস্থাশ্রম
মনুর্ভব জনয়া দৈব্যং জনম্ (ঋগ্বেদ ১০/৪৩/১৬), গৃহা মা বিভীত (যজুর্বেদ ৩/৪৯), এবং অধোরচক্ষুরপতিধন্যেধি শিবা পশুভ্যঃ সুমনাঃ সুবর্চা (ঋগ্বেদ ১০/৮৫/৪৪) এবং আচার্য মনু বলেছেন— ‘যথা বায়ুং সমাশ্রিত্য বর্তন্তে সর্বজন্তবঃ। গৃহস্থাশ্রমাত্য বর্তন্তে সর্ব আশ্রমাঃ’ (মনুস্মৃতি ৩/৭৭), অর্থাৎ যেমন বায়ুর আশ্রয়ে সমস্ত জীবের অস্তিত্ব সিদ্ধ হয়, তেমনই গৃহস্থাশ্রমের মাধ্যমে ব্রহ্মচারী, বানপ্রস্থ এবং সন্ন্যাসী—সকল আশ্রমের নির্বাহ হয়। এইভাবে ঋষি-মুনিরা মানবিক শাস্ত্রের ভিত্তিতে ধর্ম, অর্থ, কাম ও মোক্ষ প্রাপ্তির জন্য এই সহজ ও সুখদায়ী আশ্রম—গৃহস্থাশ্রমের ব্যবস্থা করেছেন। কে বলে যে আর্যদের গৃহস্থাশ্রম মোক্ষ প্রাপ্তিতে বড় বাধা? বেদে গৃহস্থাশ্রমকে মোক্ষের বড় সাধক বলা হয়েছে। বৈদিক আশ্রম ব্যবস্থা লিঙ্গ-নিরপেক্ষ, এটিই এর একমাত্র বিশেষত্ব। প্রত্যেক ব্রহ্মচারীকে গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশ করা বাধ্যতামূলক নয়। গৃহস্থাশ্রমে প্রবেশের জন্য কিছু গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা নির্ধারিত হয়েছে। নৈষ্ঠিক ব্রহ্মচর্যব্রত গ্রহণ করা পাত্রের উপর নির্ভর করে। তবে গুণ, কর্ম ও স্বভাবের বিপরীতে বিবাহ করার চেয়ে আজীবন একাকী জীবনযাপন করা শ্রেয় বলে বিবেচিত হয়েছে। এটি একটি স্বর্ণিম নীতি। মোক্ষ প্রাপ্তিতে গৃহস্থাশ্রমকে বাধক নয়, সহায়ক বলা হয়েছে। আমাদের এখানে ঋষি ও আদর্শ পুরুষরা শ্রেষ্ঠ গৃহস্থাশ্রমী ছিলেন। মর্যাদাপুরুষ রাম, যোগীরাজ শ্রীকৃষ্ণ, জনক, যাজ্ঞবল্ক্য, নারদ, ভরদ্বাজ, গুরু নানক, কবীর, মহাত্মা গান্ধী, মহাত্মা মুংশীরাম (স্বামী শ্রদ্ধানন্দ), বীর সাভারকর, মহাত্মা আনন্দ স্বামী, পণ্ডিত লেখরাম, মহামনা মালব্যজি, সত্য প্রকাশজি প্রমুখ। এই সকল মহান আত্মা গৃহস্থাশ্রমে থেকে মোক্ষগামী হয়েছেন। এছাড়াও অনেক ঋষিকা সফল গৃহস্থাশ্রমী হয়েছেন। তাই আমাদের কথা একেবারে সত্য যে, মোক্ষ প্রাপ্তির পূর্ণ অধিকার যোগ্য নারী-পুরুষের রয়েছে। এতে দেশ, কাল বা স্থানের কোনো ভেদাভেদ নেই। এই কারণেই মনুস্মৃতিতে গৃহস্থাশ্রমের তুলনা বায়ু বা প্রাণবায়ুর সঙ্গে করা হয়েছে। বৈদিক সমাজব্যবস্থা এই ধরনের অনেক বিশেষত্বে পরিপূর্ণ।
তৃতীয় সোপান - বানপ্রস্থাশ্রম
দ্বিপ্রহর পর্যন্ত জীবনযাত্রা অনেক গুণ, বিদ্যা, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতায় পরিপূর্ণ হয়েছে। ‘শত হস্ত সমাহার সহস্র হস্ত সংকিরঃ’—বেদের এই নির্দেশ অনুসারে মোক্ষাভিমুখী ব্যক্তি সমাজের কাছে নিজের সবকিছু সমর্পণ করতে প্রস্তুত। কিন্তু কর্মের পূর্বে তিনি আরও কিছু চিন্তন করে আধ্যাত্মিক সূক্ষ্ম রহস্যে মগ্ন হতে চান। এখন তিনি মৌন ধারণ করে মুনিপ্রবৃত্তিকে উৎসাহিত করতে অন্তর্মুখী হয়ে আত্মার বিকাশ সাধন করতে চান। সাংসারিক দায়িত্ব থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত হয়ে মুনি অবস্থা গ্রহণ করে শ্রম ও তপের মাধ্যমে কিছু শ্রেষ্ঠ পরিমার্জন করতে চান। লক্ষ্য কিন্তু একই। জীবনের এই দ্বিতীয় পড়াও গুরুত্বপূর্ণ। অন্তর্মুখী সাধনা সাফল্যের একটি সিঁড়ি। বর্তমানে যদি বনগমনের স্থান না থাকে, তবে ঘরেই একান্ত মনে নিজের চিন্তাধারা পরিশোধন করে তপ, সাধনা ও স্বাধ্যায় করা উচিত।
চতুর্থ সোপান - সন্ন্যাসাশ্রম
‘ইদং মম’ থেকে উঠে ‘ইদং ন মম’-এর পরিবেশে প্রবেশের অবস্থার নাম সন্ন্যাসাশ্রম। সন্ন্যাস হলো বিন্যাসের রূপান্তর। মোক্ষাভিমুখী ব্যক্তি এখন নিজের গ্রহ, গ্রাম, নগর, প্রদেশ এবং দেশ থেকেও উঁচুতে উঠে বিশ্বনীড়ের বাসিন্দা হতে চলেছেন। ‘ইদং সর্বং সমর্পয়ামি’—মানবতার কল্যাণের জন্য তিনি বিশ্বনাগরিকতা গ্রহণ করে প্রাণিমাত্রের সেবায় ওঁ ধ্বজের রঙের আবরণ গ্রহণ করেছেন। ওঁ ধ্বজের মতো পন্থনিরপেক্ষ হয়ে তিনি বিশ্বসাক্ষী হয়ে কল্যাণের পথের সূচক হয়েছেন। এমন চতুর্থ আশ্রম কি মোক্ষ প্রাপ্ত করতে পারবে না? হ্যাঁ! অবশ্যই।